চতুর্থ অধ্যায় — অসমাপ্ত অধ্যায়।
ঢাকা (কয়েক দশক পর)।
সময় গড়িয়ে গেছে। ময়ূরপুর আজ বাংলাদেশ। ইলোরার বিয়ে হয়েছিল; সে স্নেহময়ী স্ত্রী, সহৃদয়া মা, পরে দিদিমা। তবু মনের এক গোপন কুঠুরিতে সে আজীবন বাঁচিয়ে রেখেছে আরভকে—অক্ষরে, নীরবে।
বিকেলে বারান্দায় বসে ইলোরার সতেরো বছরের নাতনি অন্বেষা রোজনামচা লিখছে। স্বপ্নালু চোখে ইলোরার নিজের কৈশোর ভেসে ওঠে। সে ডেকে নেয় অন্বেষাকে। হাতে তুলে দেয় পুরোনো কাঠের একটি বাক্স—
“এ আমার জীবনের অসমাপ্ত অধ্যায়। একা হলে পড়িস।”
রাতে বাক্স খোলে অন্বেষা—হলুদচে চিঠির গুচ্ছ। একে একে পড়ে সে হারিয়ে যায় চল্লিশের দশকে—অক্ষরের ভিতর দিয়ে বেড়ে ওঠা এক প্রেমে। দিদার শেষ চিঠিতে তার চোখ ভিজে ওঠে। প্রশ্ন জাগে—আরভের কী হয়েছিল?
চিঠিগুলো থেকে কলকাতার ঠিকানা পায় সে। আধুনিক প্রযুক্তির যুগ—সামাজিক মাধ্যমে খুঁজে পায় কলকাতায় থাকা আরভের ভাইয়ের নাতিকে। দূরভাষে কথা। ওপাশের মানুষের কণ্ঠ কেঁপে ওঠে—
“ডাক্তার আরভ দে আজীবন অবিবাহিত ছিলেন। মানুষের সেবাতেই কাটিয়েছেন। মৃত্যুর পর তার জিনিসপত্রের মধ্যে একটি বাক্সে পাওয়া গিয়েছিল একগুচ্ছ না-পড়ানো চিঠি… আর একটি শেষ চিঠি—তিনি লিখেছিলেন, পাঠাতে পারেননি।”
কয়েকদিন পর কুরিয়ারে পৌঁছোয় খামটি। অন্বেষা কাঁপা হাতে খুলে—আরভের ‘শেষ চিঠি’—-
“আমার ইলোরা,
জানি না, এই চিঠি আদৌ তোমার কাছে পৌঁছোবে কি না। দেশভাগের পর অনেক খুঁজেছি। ময়ূরপুর এখন অন্য দেশ; পথ বন্ধ।
সেদিন—তোমার শেষ চিঠি পাওয়ার দিনেই—আমার জীবন থেমে গিয়েছিল। তারপর থেকে কেবল বেঁচে থাকার অভিনয়। আমার পৃথিবী এখনও সেই ১৯৪৩ সালেই আটকে আছে।
কেমন অদ্ভুত, ভাবি—আমাদের দেখা না হওয়াই কি ভালো ছিল? কল্পনায় তুমি—সেই স্বপ্নদর্শী, বিদ্রোহী তরুণী। বাস্তব হয়তো ভেঙে দিত সেই স্বপ্ন। এই ভেবে কি মনকে সান্ত্বনা দেওয়া যায়?
আমি বিশ্বাস করি—আমাদের ভালোবাসা কাগজের সীমায় থেমে ছিল না। তা ছিল আত্মার। আত্মার মিলনকে কাঁটাতার থামাতে পারে না। আমি যেখানেই থাকি, আমার আত্মা তোমার সঙ্গেই।
কখনও আকাশের দিকে তাকিয়ে আমাকে ডাকো। আমি শুনব। কারণ—ভালোবাসা দূরত্বের কাছে হারে না, সময়ের কাছেও নয়।
—ইতি, শুধু তোমার, আরভ।”
আমার নামের আগেই যে নামটি আমার সত্তায় মিশে আছে—ইলোরা,
এই পত্র যখন লিখছি, আমার হাত কাঁপছে। বার্ধক্যের কারণে? হয়তো। কিন্তু আমার মনে হয়, জীবনভর তোমার নামটি লিখতে না পারার যে যন্ত্রণা, তারই শেষ বহিঃপ্রকাশ এটি। চিকিৎসকেরা বলেন আমার আয়ু ফুরিয়ে এসেছে। কী আশ্চর্য, তাই না? যে জীবন সেই ১৯৪৩ সালেই তোমার শেষ চিঠির মসীর কালিতে থেমে গিয়েছিল, সেই জীবনের নাকি এখন ফুরোবার পালা!
লোকে বলে, আমি নাকি এক সার্থক জীবন কাটিয়েছি। মানুষের সেবা করেছি, মর্যাদা পেয়েছি। কিন্তু ওরা তো জানে না, আমার প্রকৃত জীবনটি আমি কোনোদিন বাঁচতেই পারিনি। আমার সেই জীবন তো তোমার সাথে, তোমার পত্রের প্রতিটি অক্ষরের ভেতর দিয়ে গড়া উঠেছিল। ময়ূরপুরের সেই দিঘির পাড়ে, তোমার কল্পনার সঙ্গী হয়ে আমি সহস্র বিকেল কাটিয়েছি। তোমার পাঠানো শুকনো শিউলি ফুলের সুবাসে আমি আমাদের অদেখা বাসরঘর সাজিয়েছি। আমি মনে মনে তোমার চুল বেঁধে দিয়েছি, তোমার কপালের ভাঁজে জমে থাকা দুশ্চিন্তা মুছে দিয়েছি, আর আমাদের না-হওয়া সন্তানদের ঘুমপাড়ানি গান শুনিয়েছি। এই জগৎ আমার শরীরটাকে দেখেছে, কিন্তু আমার আত্মা তো সেই কবেই কাঁটাতারের বেড়া পেরিয়ে তোমার কাছে রয়ে গেছে।
দেশভাগ, দাঙ্গা—এগুলো তো নিছক ছুতো, ইলোরা। প্রকৃত সত্য হলো, আমি হেরে গিয়েছিলাম। আমি আরও একটু চেষ্টা করতে পারতাম, আরও মরিয়া হতে পারতাম। কেন আমি নিয়তির কাছে এত সহজে হার মেনে নিলাম? এই প্রশ্নটি গত পঞ্চাশ বছর ধরে প্রতি রাতে আমার ঘুম কেড়ে নিয়েছে। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা এই নয় যে আমি তোমাকে পাইনি; আমার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো, আমি তোমাকে পাওয়ার জন্য সর্বস্ব দিয়ে লড়তে পারিনি। এই অপরাধবোধের ভার নিয়েই আমি বেঁচে থেকেছি।
এখন আমার চারপাশের ভুবন ঝাপসা হয়ে আসছে। হয়তো চোখের দৃষ্টি কমছে, কিন্তু আমি ভাবি, এ এক আশীর্বাদ। যে পৃথিবীতে তুমি নেই, সেই পৃথিবীটা স্পষ্ট করে না দেখাই শ্রেয়।
জানি না ঈশ্বর আছেন কি না। পরকাল বলেও কিছু হয় কি না। কিন্তু যদি থাকে, আর সেখানে যদি আমাদের আবার দেখা হয়, তুমি কি আমায় চিনতে পারবে? এই ক্লান্ত, পরাজিত মুখটার আড়ালে থাকা তোমার সেই আরভকে খুঁজে নেবে?
কিচ্ছু চেয়ো না আমার কাছে, শুধু একটিবার তোমার হাতটি আমার হাতে রেখো। আমি আমার সারা জীবনের না-বলা কথাগুলো, আমার সমস্ত সঞ্চিত ভালোবাসা তোমার হাতের ওই একটি স্পর্শে উজাড় করে দেবো।
তোমার পথ চেয়ে বেঁচেছিলাম। এবার তোমার পথ চেয়েই মরতে চলেছি। আমি বিশ্বাস করি—আমাদের ভালোবাসা কাগজের সীমায় থেমে ছিল না। তা ছিল আত্মার। আত্মার মিলনকে কাঁটাতার থামাতে পারে না। আমি যেখানেই থাকি, আমার আত্মা তোমার সঙ্গেই।
কখনও আকাশের দিকে তাকিয়ে আমাকে ডেকো। আমি শুনব। কারণ—ভালোবাসা দূরত্বের কাছে হারে না, সময়ের কাছেও নয়।
—ইতি, শুধু তোমার, আরভ”
চিঠিটা দিদার কোলের উপর রেখে অন্বেষা তাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরল। বাইরে তখন সন্ধ্যা নামছে। দুটি ভিন্ন দেশের আকাশে তখন একই চাঁদ উঠছে, যা বহু বছর ধরে দুই নীরব প্রেমিকের না বলা কথার সাক্ষী হয়ে ছিল।
— শুভজিৎ ঘোষ


Leave a Reply