দ্বিতীয় অধ্যায়।
কলকাতায় ফেরার এক মাস পর, গোধূলি। ছাত্রাবাসে বসে আরভ। ডাকহরকরা খাম ধরায়। মুক্তোর মতো সুশৃঙ্খল হস্তাক্ষর, প্রেরক—ইলোরা চৌধুরী, ময়ূরপুর।
‘শ্রদ্ধেয় চিকিৎসক মহাশয়, প্রণাম নেবেন। আপনি বাবাকে যে নূতন জীবন দান করিয়াছেন, তাহার কৃতজ্ঞতা কথায় ধরিতে পারি না। আপনার চিকিৎসার পর এই বাড়ির কোণাগুলো যেন আলোকিত। আপনার ঠিকানাটি ব্যবস্থাপকের নিকট হইতে পাইয়াছি—অনধিকার বলিয়া নেবেন না। আপনি যখন বাবার সহিত কথা বলিতেন, আমি পর্দার আড়াল হইতে দেখিতাম। আপনার চোখের স্থিরতা ও করুণার আভাসটি মনে রয়ে গিয়াছে।—ইতি, এক কৃতজ্ঞ কন্যা, ইলোরা চৌধুরী’
চিঠি পড়েই আরভ বুঝে ফেলে—পর্দার আড়ালের মেয়েটি সাধারণ নয়। সেদিন রাতেই সে জবাব লেখে—
‘কল্যাণীয়া, চিঠি পেয়ে সম্মানিত। আমি কর্তব্য করেছি মাত্র। আপনার চিঠির আন্তরিকতা আমাকে ছুঁয়েছে। ময়ূরপুরের দিঘি, গাছ, নিঃশব্দ আলো—কলকাতার কোলাহলের বাইরে এমন জগৎ ছিল, চোখে দেখা হল আপনার কথায়। সময় পেলে লিখবেন।’
উত্তর আসে। আরও দীর্ঘ, ব্যক্তিগত।
”আপনি দিঘির কথা জানতে চেয়েছেন। দিঘিটাই আমার একমাত্র বন্ধু। মন ভারী হলে তার পাড়ে বসি। আকাশ যখন জলে নেমে আসে, মনে হয়— আমার ছোট্ট জগৎটার বাইরে আরও বড় আকাশ আছে। আমি কি কোনোদিন সেখানে উড়তে পারব?… আপনি কি ‘বলাকা’ পড়েছেন? ‘হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে’—লাইনটি সারাদিন বাজে। আপনারও কি কখনও এমন মনে হয়? আপনার স্বপ্ন কী?”
তাদের চিঠিতে সাহিত্য, দর্শন, স্বপ্ন, একাকীত্ব—সব মিশে যায়।’ ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’তে নামতে সময় লাগে না। আরভ গোপন স্বপ্ন জানায়—গ্রামে সেবা করা, পাশে এমন এক সঙ্গী—যার সঙ্গে কথা ভাগ করা যায়। ইলোরা জবাব দেয়—
‘তোমার চিঠি পড়লেই বুকটা কেমন করে ওঠে। মনে হয়, কেউ একজন আছে—যে আমার ভেতরের বন্দিনী পাখির ডাক শুনতে পায়। তোমার কণ্ঠ জানি না, মুখও না; তবু তুমি—সবচেয়ে কাছের।’
কালি আর কাগজে তাদের প্রেম ধীরে, দৃঢ়—শব্দের ভিতরে ভিতরে।


Leave a Reply