শেষ চিঠি

691 Views

প্রথম অধ্যায়।

কলকাতা, ১৯৪০।

বাতিটা টলটলে আলো ফেলছে আরভ দে-র টেবিলের কোণে। বাইরে ট্রামের ধীর ঘর্ঘর, ভেজা রাস্তা চিরে ঘোড়ার গাড়ির টগবগ, আর দূরে কোথাও কারখানার ভোঁ—সব মিলিয়ে এক নিঃশব্দ ঐকতান; যেন শহরের নিজের নিঃশ্বাস। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র আরভ—নিম্নমধ্যবিত্ত ঘর, চোখে একরাশ স্বপ্ন, বুকে আদর্শের গরম। তার জগৎ—বই, মানুষের শরীর, আর তারও গভীরে—মন।

দেয়ালে শারীরস্থানচিত্র; পাশে সযত্নে রাখা রবীন্দ্রনাথের সঞ্চয়িতা। আরভ বিশ্বাস করে, শরীর সারাতে হলে আগে মানুষের আত্মাটাকে বুঝতে হয়। সেই আত্মার খোঁজ সে পায় কবিতার পঙ্‌ক্তিতে, উপন্যাসের চরিত্রে, আর নিজের রোজনামচায়।

আজও সে লিখছে—মানুষের একাকীত্ব নিয়ে।—“মানুষ একা জন্মায়, একা মরে। মাঝের পথে সে মরিয়া হয়ে খোঁজে আরেকজন মানুষ… যাকে সব ফাঁক উজাড় করে দেওয়া যায়। সত্যিই কি পূরণ হয় সেই শূন্যতা?” বাক্যটি এসে থেমে যায়। জানলার কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটা মুক্তোর মতো জ্বলছে। তার মনে হয়—শহরটাও আজ যেন একা।

পূর্ব বাংলা, ফরিদপুর—ময়ূরপুর।

কলকাতার কোলাহল থেকে দূরে, সবুজে মুড়ে থাকা ময়ূরপুর সময়ের বাইরে আলাদা এক জগৎ। এখানে সময় চলে নদীর স্রোতে, ধানের খেতে হাওয়ার দোলায়, আর জমিদারবাড়ির অন্দরের অনুশাসনে। সেই বাড়িরই মেয়ে—ইলোরা। পর্দার আড়ালে বড় হওয়া, বইয়ের পাতায় পাখা মেলা এক তরুণী। সে বাইরের জগৎ দেখেনি; অথচ রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিম, শেক্সপিয়রের হাত ধরে সে ঘুরে এসেছে অনেক দূর।

ইলোরার ঘর তার দুর্গ—পেছনের দিঘির দিকে খোলা বড় জানলা। জানলার ধারে বসে সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটায়। হাতে বই, নইলে সাদা কাগজ আর কলম। সে লেখে; তবে দেখাতে সাহস পায় না। তার লেখায় চাপা বিদ্রোহ, মুক্তির আকুলতা।

জমিদার প্রতাপ নারায়ণ চৌধুরী—রাশভারী। মেয়ের পড়াশোনায় বাধা নেই; তবু সমাজের সীমানা টপকানোর অনুমতি নেই। ইলোরা সুন্দর জগৎ পায়, সীমিতও পায়। তার ভিতরে ঝড় রয়েছে; বাড়ির কারও বোঝার মতো নয়।

হঠাৎ ঢেউ লাগে সেই নিস্তরঙ্গ জীবনে। প্রতাপ নারায়ণ গুরুতর অসুস্থ। কবিরাজ-বৈদ্য ব্যর্থ। এর মধ্যেই খবর—কলকাতা থেকে চিকিৎসাশিবির করছে একদল তরুণ। তাদেরই একজন, আরভ দে, আসে জমিদারবাড়িতে।

অন্দরে ঢুকেই আরভের মনে হয়—অন্য যুগে পা রাখল। উঁচু ছাদ, শীতল থাম, নিস্তব্ধতা। প্রতাপ নারায়ণকে পরীক্ষা করতে করতে তার চোখে পড়ে—পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা এক ছায়া; মুখ দেখা যায় না, কিন্তু উদ্বিগ্ন দুটি চোখের উপস্থিতি ধরা পড়ে।

চিকিৎসায় প্রতাপ নারায়ণ সুস্থ হন। ফেরার আগে আরভ কলকাতার ঠিকানা লেখা এক টুকরো কাগজ ব্যবস্থাপকের হাতে দিয়ে বলে—“—“খবর লাগলে লিখবেন।” সে জানে না, এই সামান্য ঠিকানাটাই হবে দুই আত্মার একমাত্র সেতু।

Pages: 1 2 3 4

কমেন্ট

6 responses to “শেষ চিঠি”

  1. Partha mitra Avatar
    Partha mitra

    Darun dada

  2. Partha mitra Avatar
    Partha mitra

    Darun dada

    1. Subhajit Ghosh Avatar
      Subhajit Ghosh

      অনেক ধন্যবাদ🙏

  3. Partha mitra Avatar
    Partha mitra

    Valo laglo dada

  4. Ananya Chaudhury Avatar
    Ananya Chaudhury

    Asadharon!! Bhison bhalo laglo porey.

  5. Ashok Saha Avatar
    Ashok Saha

    হৃদয় ছুয়ে যাওয়া লেখা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *