কৈলাসবাসিনী কথা

757 Views

উনিশ শতকে এই বঙ্গদেশে নারীশিক্ষার ব্যাপারটি ছিল এক অকল্পনীয় ব্যাপার।  নারীশিক্ষাকে সেই সময়ে গর্হিত অপরাধ বলে মনে করা হতো।  কুসংস্কারাচ্ছন্ন সেই সমাজে লেখাপড়া করলে বৈধব্যযোগ নিশ্চিত, এমন কী  সংসারে অমঙ্গল ঘটার অনিবার্যতা ইত্যাদি বিশ্বাস নিয়ে সদাই শঙ্কিত নারীকুলের এক বৃহদংশ হয়ে উঠেছিল শিক্ষাবিমুখ।  কিশোরী কৈলাসবাসিনীও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না।  তিনিও মেয়েদের লেখাপড়া শেখার ব্যাপারটিকে ঘৃণার চোখেই দেখতেন। ১২ বছর বয়সে তাঁর যখন দুর্গাচরণ গুপ্তর সঙ্গে বিবাহ হয়, তখন তিনি  ছিলেন নিরক্ষর।   সৌভাগ্যবশতঃ এই দুর্গাচরণ যিনি  নিজে শুধু ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন তাই নয়, তিনি তাঁর স্ত্রীকে লেখাপড়া শেখাবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন  এবং অবশ্যই সফল হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন  সে যুগের  শিক্ষিত সমাজোর এক উদারমনস্ক সুযোগ্য  প্রতিনিধি। বাঙালি শিক্ষিত সমাজে সে সময়ে পুরুষদের মধ্যে স্ত্রীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে সচেতনাবোধ  বৃদ্ধি পাচ্ছিল। দাম্পত্যজীবনকে সুখী এবং সফল করার জন্য স্বামীর মতো স্ত্রীরও শিক্ষা এবং মানসিক বিকাশের প্রয়োজন সে কথা যুবকেরাও অনুভব করেছিলেন। বেথুন সোসাইটির এক সভায় নব্য শিক্ষিতদের একজন  বলেছিলেন যে মিহিলাদের অশিক্ষিত রেখে কোনও জাতি সভ্য হতে পারে না।

 দুর্গাচরণের একটি নিজস্ব ছাপাখানা ছিল যেখান থেকে তাঁর রচিত গ্রন্থাবলী প্রকাশিত হতো। এছাড়া তিনি  একাধিক অভিধান সম্পাদনা করেছিলেন। এর বাইরে গুপ্ত প্রেস থেকে  পঞ্জিকা বের করেছিলেন যা আজ এতো বছর পরেও অনেক বাঙালির  ঘরে দৃশ্যমান।

দুর্গাচরণ কৈলাসবাসিনীকে শিক্ষা দিতে শুরু করেন গোপনে রাতের অন্ধকারে আত্মীয় পরিজনের চোখের আড়ালে। সংসারের কাজে ক্লান্ত বালিকা স্ত্রী অনেক সময়েই ঘুমে ঢুলে পড়তেন, কিন্তু দুর্গাচরণ অটল থাকতেন তাঁর কর্তব্যসাধনে। প্রথমদিকে পড়াশুনোয় একান্ত অনিচ্ছুক  কৈলাসবাসিনীকে তাঁর স্বামী স্নেহে, মমতায় এবং অতি ধৈর্য সহকারে এমনভাবে শিক্ষা দিতেন যে অচিরেই তিনি পড়াশুনোয় যথেষ্ট পারদর্শী হয়ে ওঠেন। দুর্গাচরণ শুধু যে তাঁকে লেখাপড়াই  শেখাতেন তাই নয়, ধর্মের নামে যে সব কুসংস্কার সমাজে প্রচলিত ছিল তার বিরুদ্ধে তাঁকে সচেতন করে তুলেছিলেন। শিক্ষা গ্রহণে কৈলাসবাসিনী ক্রমে যথেষ্ট আগ্রহী হয়ে ওঠেন এবং তাঁর অসাধারণ বুদ্ধি এবং মেধা অতি স্বল্প দিনে তাঁকে এক বিরল স্বীকৃতি  এনে দেয়। ১৮৩৯ সালে যে বালিকা অক্ষর পর্যন্ত চিনতেন না, তিনি তার  ১৩/১৪ বছরের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচনা করে উঠতে  সমর্থ হন।  সে যুগে কৈলাসবাসিনী দেবীকে তাঁর স্বামী যেমন গোপনে শিক্ষা দিয়েছিলেন,  ঠিক তেমনই বহু ইংরেজি  শিক্ষিত যুবকেরা তাঁদের স্ত্রীদের শিক্ষা দেবার চেষ্টা  করেছিলেন। তবে সবাই সফল হননি, কারণ সবাই তো আর কৈলাসবাসিনী নন। কৈলাসবাসিনী ছিলেন সত্যিকারের একজন প্রতিভাশালী নারী। তাঁর মেধার গুণে  তিনি যা অর্জন করেছিলেন তা অন্যদের পক্ষে করা সম্ভব ছিল না।  

এসবের মধ্যেও নারীশিক্ষার বিরুদ্ধে সমাজের চোখ রাঙানো কিন্তু জারি ছিল। বিদ্যাসাগর, রামমোহন প্রমুখ সমাজ সংস্কারকরা নারীশিক্ষার পক্ষে সোচ্চার হলেও সমাজের কিছু মান্যগণ্য ব্যক্তি, সাহিত্য জগতের চূড়ামণিরা একে ভালো চোখে দেখেননি।  নারীশিক্ষার বিরুদ্ধাচরণে কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত মহাশয় তো  প্রায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন।   ‘বাঙালির মেয়ে’ শীর্ষক কবিতায় তিনি লিখেছিলেন, ‘একার বেথুন এসে শেষ করেছে, আর কি তাদের তেমন পাবে?’……… ‘কপালে যা লেখা আছে/ তার ফল তো হবেই হবে!/ ,এরা এ বি পড়ে বিবি সেজে/বিলিতি বোল কবেই কবে!’ সমাজের এই  প্রতিকূল অবস্থাকে গ্রাহ্য না করে দুর্গাচরণ কিন্তু স্বীয় কর্তব্যে অবিচল থেকেছেন। তাঁর শিক্ষা এবং অবশ্যই কৈলাসবাসিনীর প্রতিভা, তাঁর একনিষ্ঠা, সর্বোপরি স্বামী-স্ত্রীর  যৌথ উদ্যম তাঁদের সিদ্ধিলাভকে  ত্বরান্বিত করেছিল।  

লেখাপড়া শেখার মাঝে কৈলাসবাসিনী নিজেও স্বাধীনভাবে কিছু লেখালিখি শুরু করেছিলেন। সামাজিক অন্যায় অবিচার নিয়ে তাঁর বক্তব্য ক্রমে ভাষা পেল তাঁর কলমে। একদিন গভীর রাতে তিনি তাঁর লেখার একটি পাতা তুলে দিলেন তাঁর গুরুর হাতে।  সেই লেখা পড়ে দুর্গাচরণ বিস্মিত এবং মুগ্ধ। স্থির করলেন তিনি  গ্রন্থ প্রকাশ করবেন। স্বামীর উৎসাহ এবং পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকাশ পেল কৈলাসবাসিনীর প্রথম গ্রন্থ ‘হিন্দু মহিলার হীনাবস্থা’। দুর্গাচরণ লেখালিখির ক্ষেত্রে লিঙ্গ ভেদে বিশ্বাসী ছিলেন না। এই কারণে তিনি গ্রন্থে কৈলাসবাসিনীকে ‘গ্রন্থকার’ বলে উল্লেখ করেছিলেন।  স্বামীর শিক্ষা এবং উৎসাহে কৈলাসবাসিনী বাংলা ভাষা এতো ভালো আয়ত্ত  করেছিলেন যে তাঁর গ্রন্থে  লিখিত গদ্য অত্যন্ত প্রশংসিত হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বলিষ্ঠ গদ্যের সঙ্গে কৈলাসবাসিনীর গদ্যের তুলনা করা হতো। কৈলাসবাসিনীর রচনাশৈলী, তাঁর ভাষার স্বচ্ছন্দতা, তাঁর বাক্য কাঠামো দেখে অনেকেই  আবার  মনে করেছিলেন ‘গ্রন্থকার’একজন পুরুষ। শেষ পর্যন্ত তাঁরই লেখা ‘হিন্দু অবলাকুলের বিদ্যাভাস’ গ্রন্থের প্রতিষ্ঠাপত্রে আনন্দচন্দ্র বেদান্তবাগীশকে জানাতে হয়েছিল যে কৈলাসবাসিনীর প্রথম গ্রন্থ’ হিন্দু মহিলার হীনাবস্থা’ তাঁরই লেখা, কোনও পুরুষের লেখা নয়।

কৈলাসবাসিনী   তাঁর  প্রথম গ্রন্থে সমাজের নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেছিলেন। তিনি স্ত্রীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে যেমন বিস্তারিত আলোচনা করেছেন, তেমনি তিনি তুলে ধরেছেন মহিলাদের অবরোধ প্রথা,  কৌলিন্য প্রথার বিরুদ্ধে লেখিকার নিজের বক্তব্য। হিন্দু সমাজে মেয়েদের কেন শিক্ষা দেওয়া হয় না, অশিক্ষার কুফল কী, কেন মেয়েদের শিক্ষা দেওয়া উচিত ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কৈলাসবাসিনী তাঁর গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।  হিন্দু মহিলাদের দুরবস্থার  প্রধান কারণ  যে  শিক্ষার অভাব, সেটি তিনি অন্তর দিয়ে অনুভব করেছিলেন। পুরুষ নারীর সম্পর্কের নানাবিধ সমস্যা, বিধবা বিবাহ ইত্যাদি নিয়ে স্পষ্ট ভাবে, প্রকাশ্যে আলোচনা করার রীতি ছিল না সে যুগে। পুরুষ লেখকরাও মোটামুটি এড়িয়ে চলতেন এই  সব বিষয়।  সে ক্ষেত্রে কৈলাসবাসিনী কিন্তু সমাজের পরোয়া না করে তাঁর গ্রন্থে এই সব সমস্যার সমাধানের ওপরে আলোকপাত করেছেন। বিধবাবিবাহ বিষয়েও তাঁর বক্তব্য ছিল সুস্পষ্ট। বিধবাবিবাহ আইনকেও তিনি সমর্থন করেছিলেন। এমন কী সে যুগে দাঁড়িয়ে তিনি প্রণয়ঘটিত বিবাহের পক্ষে তাঁর মতামত প্রকাশ করেছেন। বিবাহের পূর্বে মায়ের জন্য বরের ‘দাসী আনতে যাওয়া’র উক্তি নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন।  বধূ শ্বশুরগৃহে আসার পরে যেন সেই উক্তি মেনেই বধূর সঙ্গে দাসীর মতো ব্যবহার করার রীতিকে নিন্দা করেছেন  তিনি। তাঁর এই সাহস এবং স্পষ্ট লিখনের ক্ষমতা তাঁকে এক ভিন্ন মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছিল।

                                                                                                                                                                                                                                                                                                                           বিদ্যা অর্জনের ক্ষেত্রে স্বামীর অবদানের  কথা কৈলাসবাসিনী চিরদিন কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেছেন। তাঁর তৃতীয় গ্রন্থ ‘বিশ্বশোভা”র উৎসর্গপত্রে তিনি লিখেছিলেন,” পরমপূজ্যপাদ শ্রীযুক্ত বাবু দুর্গাচরণ গুপ্ত মহাশয় শ্রীচরণাম্বুজেষু

প্রণতিপুরঃসর নিবেদনমিদং-  ধর ধর সখা এই প্রিয় উপহার/ যাহে তব স্নেহরাশি  করিছে প্রচার/ স্নেহ করি সযতনে দিয়া উপদেশ/ সুপবিত্র  করিয়াছ মম মনোদেশ।/ তোমার  কৃপায় আমি পেয়ে এই জ্ঞান/ অখিল —পতির কৃপা করিছি ব্যাখ্যন “।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে  কৈলাসবাসিনীর মনোভাবে পরবর্তীকালে এক সীমাবদ্ধতা লক্ষ্য করা গিয়েছে। যেমন সেকালের নবশিক্ষিত মেয়েদের সম্বন্ধে মনে হয় তাঁর ধারণা খুব একটা উঁচু ছিল  না। তিনি ‘হিন্দু অবলাকুলের বিদ্যাভ্যাস’ গ্রন্থে লিখেছিলেন, ‘বিদ্যাভিলাসী  কামিনীকুলের অনেককেই সাংসারিক  কার্যে উপেক্ষা করিতে দেখা যায়। তাঁহারা সংসারের কোন কার্যই নির্বাহ করিতে ইচ্ছা করেন না।’ সে কালে স্ত্রী শিক্ষার বিরুদ্ধে যে সব যুক্তি  রক্ষণশীল ব্যক্তিরা দিতেন তার মধ্যে প্রধান একটি যুক্তি ছিল যে লেখাপড়া শেখা মেয়েরা সাধারণত গৃহকর্ম বিমুখ হয়। কৈলাসবাসিনী কিন্তু তাঁর গ্রন্থে সেই একই মনোভাব প্রকাশ করেছেন।

অতি অল্প দিনের ব্যবধানে কৈলাসবাসিনীর মধ্যে ধর্মচিন্তা এবং আধ্যাত্মিক বোধ‘ বৃদ্ধি পেতে থাকে। ‘হিন্দু মহিলার হীনাবস্থা’ গ্রন্থে   কৈলাসবাসিনীর আলোচ্য বিষয় ছিল  সমাজ সংস্কার,  নারীশিক্ষা ও নারী প্রগতি। কিন্তু কিছু কালের  মধ্যেই তাঁর দৃষ্টিভঙ্গীতে আসে পরিবর্তন। মাত্র  ৩২ বছর বয়সে  লেখা  তাঁর তৃতীয় গ্রন্থ  ‘বিশ্বশোভা’তে  তাঁর  সেই পরিবর্তিত মনোভাব প্রকাশ পায়।  তাঁর  দৃষ্টি সমাজের সমস্যা থেকে সরে গিয়ে এমন এক বিশ্বের  প্রতি  আকর্ষিত হয় যার অপার সৌন্দর্য এবং বিশ্বস্রষ্টার মাহাত্ম্য  হয়ে উঠেছিল তাঁর গ্রন্থের মূল বিষয়। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে কৈলাসবাসিনীর এই পরিবর্তন আজ আশ্চর্যজনক বলে মনে হলেও, সে যুগের পরিপ্রেক্ষিতে কিন্তু এই পরিবর্তন খুব অস্বাভাবিক ছিলনা,  বিশেষ করে মহিলাদের ক্ষেত্রে। এমন কী পরবর্তীকালে  কৃষ্ণভাবিনী দাস, বেগম রোকেয়ার মতো নারীবাদীরাও এর  ব্যতিক্রম  ছিলেন না। বাংলা সাহিত্যের জগৎ থেকে কৈলাসবাসিনীর আকস্মিক নিষ্ক্রমণের পিছনে তাঁর জাগতিক বিষয়ে অকাল বৈরাগ্য বা কোনও ব্যক্তিগত অভিমান এর কারণ কিনা  তা জানা যায়নি। তবে সেই সব অশিক্ষার দিনে তাঁর মতো এমন এক বিরল প্রতিভাশালী  সম্ভাবনাময় উজ্জ্বল তারকার এভাবে নিঃশব্দ বিদায়, বাংলা সাহিত্য এবং সমাজের ক্ষেত্রে যে একটি শূন্যতা সৃষ্টি করেছিল তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

আলপনা ঘোষ

কমেন্ট

4 responses to “কৈলাসবাসিনী কথা”

  1. Santwana Chakraverty Avatar
    Santwana Chakraverty

    “Your presentation on ‘কৈলাশবাসিনির কথা’ was excellent and highly informative. We look forward to more such fact-based compositions from you.”

  2. Debashis dasgupta Avatar
    Debashis dasgupta

    দিদি, খুব ভালো লাগল। এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেললাম।

  3. Dipankar Sen Avatar
    Dipankar Sen

    Many thanks for the marvellous,awesome tribute to Kailashbashini ,who braved all obstructions from society and flourished as a female writer through the guidance and encouragement ofher husband Durga Charan Gupta.It is such a pity that she quit writing so early in life.

  4. Krishna Sarkar Avatar
    Krishna Sarkar

    Alpona Ghosh er lekha Kailasbasini Probondhoti Porey Mon Bhorey Gyalo. Ak Somoye Nari Nigroho’r
    Kahini Kichhu Jana Thakleo, Ei Kahini Ti Lekkha’r Goon e Khubi
    Akorshoniyo Hoyechhey. Kailasbasini’r Lekha Kono Boi er Sondhan Peley Ami Portey Agrohi.
    Sheshey Boli…. Ei Sob Na Jana Ba Ardhek Jana Manush der Kothaa janano’r Jonyo Lekhika Ke Dhonyobad.
    Ar Tnar Sohoj Sorol Bhasha e Lekha Ti Amaar Khub Bhalo Legechhey.
    Anek Sosroddho Shubechha Janai Tnakey.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *