ঘেরা ছায়া

260 Views

“ছায়া মানে শুধু গাছের নিচে বসা নয়,ছায়া মানে মা।যে নিজের ছায়া দিয়ে অন্যকে ঢেকে রাখে,আর নিজে জ্বলন্ত রোদের নিচে দাঁড়িয়ে থাকে।”

পুকুরের জলে তখন পড়ন্ত রোদ,আর আম পাতার ফাঁক দিয়ে বাতাসে দুলে উঠছে একটি শুকনো শালপাতা।

পাশেই মাটিতে বসে আছেন শোভাময়ী দেবী। গালে রোদের ছায়া,হাতে একটি ছেঁড়া শাড়ির আঁচল,আর সামনে তাঁর গাছেরা—লাউয়ের লতা,চালকুমড়োর মাচা,নিমগাছ,বেলগাছ, আর বাঁশঝাড়।সব যেন তাঁকে ঘিরে রেখেছে নিঃশব্দে।

এই বাড়ির চারপাশ জুড়ে ছিল সবুজের সংসার।পাঁচ বিঘে জমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই বাড়ি যেন কেবল ইট-কাঠের তৈরি নয়, ছিল ইতিহাসে ভরা এক জীবন।

যেখানে প্রতিটি গাছ তাঁর হাতে লাগানো, প্রতিটি লতা তাঁর চোখের জলে ভেজা।

শোভাময়ীর স্বামী হরিপদ ছিলেন এক সাধারণ কৃষক।কিন্তু তাঁর চোখে ছিল সম্মান, আর বুকে ছিল সততার জমি।

তিনি বলতেন—“গাছ যেমন নিজের ছায়া নিজে ব্যবহার করে না,মা-ও নিজের ভাল কিছু নিজের জন্য রাখে না।”

তাঁদের একটিই ছেলে—কৌশিক।ছোটবেলা থেকেই মা আর বাবা মিলে মানুষ করতেন অনেক কষ্টে।হরিপদ নিজের হাতে চাষ করতেন,আর শোভাময়ী বাড়ির সামনে পিছনে বাগান করতেন।মাটির ঘ্রাণে তাঁর জীবনের শ্বাস।লাউয়ের ডগা ছেঁটে বড়ার তরকারি বানাতেন,চাল কুমড়োর বীজ শুকিয়ে রাখতেন পরের বারের জন্য।

শীতে খেজুর রসের হাড়ি ফুটত উঠোনে।

গরমে তুলসীতলার সামনে বসে জল দিতেন তিনি।পুকুরে স্নান করতেন সকালে,আর সন্ধ্যায় বসতেন সেই পুকুরঘাটে,তুলসী তলায়।মনে মনে বলতেন,“ভগবান,আমার গাছগুলো সারাকাল বেঁচে থাকে।আর আমার ছেলে যেন এই মাটির মতো সহজ সরল ত্যাগী হয়।”

বছর চলে যায়,সময় গড়িয়ে চলে।কৌশিক বড় হল,শহরে পড়তে গেল।শিক্ষা শেষে কাজকর্ম খুঁজে ঘুরে বেড়াল কিছুদিন।

অবশেষে ফিরে এল খালি হাতে।না একেবারে খালি হাতে না,হাতে একটা মেয়ের হাত।

নীলার সঙ্গে বিয়ে হল।সুন্দরী,শহুরে,চোখে শিশুর মতো কৌতুহল,কণ্ঠে স্নেহের খেলা।

প্রথম দিন শোভাময়ীর চোখে জল এসে গিয়েছিল নীলার কথা শুনে।

সে বলেছিল—“মা,তোমার গাছগাছালি দেখেই মনে হল,এই বাড়ির মাটির গন্ধ আলাদা।তুমি আমায় এই গাছেদের মতো ভালোবাসো,আমি তোমায় পাতার মতো আগলে রাখব।”

সেই কথাগুলো যেন ছায়ার মতো ছড়িয়ে পড়েছিল শোভাময়ীর হৃদয়ে।

প্রথম তিন মাস যেন স্বপ্নের মতো কেটেছিল।

নীলা মাঝে মাঝে তুলসীতলায় ধূপ জ্বালাত। পুকুর থেকে মা’র স্নানের পর শাড়ি এনে মেলত রোদে।শোভাময়ী ভাবতেন—

“হয়তো আমার ছায়ার মধ্যে সত্যিই কারো ঠাঁই হয়েছে।”

একদিন সন্ধ্যায় কৌশিক এসে বলল,

— “মা,একটা কথা বলব?”

— “বল বাবা।”

— “সরকারি এক কৃষি প্রকল্পে আবেদন করতে চাইছি।জমির দলিল চাই।তুমি তো জানো,সব তোমার নামে।যদি এখনই আমার নামে লিখে দাও,ব্যাঙ্ক থেকে লোন নেওয়া সহজ হবে।”

শোভাময়ী স্তব্ধ।তুলসী গাছের দিকে তাকালেন,যেন শোনার অপেক্ষায়।

নীলাও পাশে এসে দাঁড়াল,মিষ্টি কণ্ঠে বলল—

“মা,জমি বাড়ি যেমন তোমার,আমরা কি তোমার নয়?তুমি সহ এই সংসার তো আমাদের,তাই না?তুমি আমাদের মতোই আছো থাকবে,কাগজে থাকো না থাকো কী এসে যায়?”

মায়ের মন বাঁধ ভেঙে গেল।

তিনি যেন হরিপদের মুখে শুনতে পেলেন—

“না,এই ভিটে ছেড়ে যেও না।”তবুও সেই অব্যক্ত আকাশবাণীকে অগ্ৰাহ্য করে ভাবলেন,সন্তানের মুখের উপর তো কখনও কেউ তালা বসাতে পারে না!

আর সাতপাঁচ না ভেবে তিনি বললেন,

“তুই ভালো থাকিস বাবা।তোদের সংসার বড় হোক।আমি তোদের ছাড়া কিছুই চাই না।”

তিনদিন পরে রেজিস্ট্রিতে সই করে দিলেন।

পাঁচ বিঘে জমি,যার মধ্যে ছিল পুকুর, বাঁশঝাড়,আম-কাঁঠালের বাগান,সবই চলে গেল ছেলের নামে।

তখনও তাঁর মনে দুঃখ ছিল না।

তিনি ভাবলেন—“আমি তো এখানেই আছি। এই গাছগুলো,পুকুর,এই তুলসী—এরা তো আমায় ভুলবে না।”

সেদিন সন্ধ্যায় পুকুরপাড়ে বসে শেষবারের মতো তিনি হাত রাখলেন একটুকরো চাল কুমড়োর লতায়।

একটা নতুন কচি লাউয়ের মুখে হাত বুলিয়ে বললেন—“তুই থাকিস রে।আমি যদি একদিন না থাকি,তুই আমার কথা বলবি বাতাসে। শোনাতে পারবি?”

পাতাগুলো যেন একটু বেশি দুলে উঠেছিল সেইদিন।

কিন্তু কেউই জানত না,

একটা সই যে কেবল জমির নয়,

মায়ের ঘরের বাতাস,আশ্রয়,বিশ্বাসের এবং ভালোবাসার মৃত্যুদণ্ড ছিল।

“যে ঘর একদিন আশ্রয় ছিল,সেই ঘরই যদি একদিন আতঙ্ক হয়ে ওঠে,

তবে মানুষের ছায়াটাও পালিয়ে যায় নিজ শরীর থেকে।”

সই করা কাগজ আদালতের মোহরে গেলে, কাগজের ভাষা অনুযায়ী সব সম্পত্তি এখন কৌশিকের নামে।

তবে শোভাময়ীর চোখে তখনও গাছেরা সব আগের মতোই সবুজ।

কিন্তু তিনি জানেন না,তাঁর মতো সন্তান স্নেহশীল মায়েদের জানার কথাও না,শুধু কাগজে নয়, ধীরে ধীরে বদলে যাবে চারপাশের হাওয়াও।

প্রথম পরিবর্তন শুরু হল সকালে।

প্রতিদিন যে উঠোনে বসে তিনি তুলসীতে জল দিতেন,সেখানে একদিন এসে বউমা নীলা বলল,“মা, এই তুলসী থানটা একটু সরিয়ে দিলে ভালো হয়।উঠোনে নতুন ফ্লোরিং হবে, পাথর বসবে।ঝাঁট দিতেও সমস্যা হয়।”

মায়ের মন কেঁপে উঠল।

তুলসী তো শুধু গাছ নয়,

তাঁর প্রাণের ঠাকুরের প্রতিমূর্তি !

তবু তিনি কিছু বলেন না।

এক কোণে নিয়ে যান তুলসী থান—পুকুর ঘাটের ধারে।

চোখের জল আটকে রাখেন,মনে মনে বলেন,

“তুই রাগ করিস না মা।আমি আবার তোর ঘর গড়ে দেবো।”

পরদিন সকালে শোভাময়ী যেমন করতেন, তেমনি চাল কুমড়োর লতায় জল দিতে গিয়েছেন।

নীলা এগিয়ে এসে বলল,

— “মা,এগুলো নিয়ে আর এত ঝামেলা কোরো না।এই লতা-পাতা,এই কুমড়ো,পুঁইশাক—সব তো এখন আর টাকার দাম রাখে না।বরং উঠোনটা পরিষ্কার থাকলে ভালো দেখায়।”

শোভাময়ীর হাত কেঁপে ওঠে।

তিনি চুপ করে বসে পড়েন এক কোণায়।

আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখেন একটা কাক উড়ে যাচ্ছে—বাঁশঝাড়ের ওপাশে।

সেই বাঁশঝাড়ও একদিন কাটা পড়বে,

সেটা তিনি তখনও জানতেন না।

কিছুদিন পর নীলা বলল—

— “মা,তুমি নিজের ঘরটা একটু গুছিয়ে নাও। ঘরের খাট,জিনিসপত্র বদলাতে হবে।তোমার আলমারি থেকে পুরনো শাড়িগুলো বের করে দাও।আমি সেলাই মেশিন বসাবো।”

কথাগুলো শুনে শোভাময়ী মনে মনে ভাবেন—

এ ঘরই তো আমার একমাত্র সম্বল!

এই ঘরেই হরিপদর শেষ নিঃশ্বাস পড়েছিল। এই মেঝেতে বসে আমি চাল কেটেছি,পুঁইশাক কেটেছি,কৌশিককে দুধ খাইয়েছি!

তবু তিনি কিছু বলেন না।

তাঁর নীরবতা এখন এই বাড়ির সবচেয়ে বড় অপরাধ।

দিন যায়।

একদিন দুপুরে পুকুরে কাপড় কাচার সময়, পেছন থেকে ছেলে বলে—

“মা,তুমি এখন একটু নিজের মত থাকো। তোমার শরীর তো তেমন ভালো না।বেশি কাজকর্ম করে ক্লান্ত হয়ে পড়ো।এখন বয়স হয়েছে তো।”

শোভাময়ী ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন কৌশিকের চোখে।

খুঁজে পান না সেই শিশুটিকে,

যে একদিন আমগাছের ডালে দোল খেয়ে বলেছিল—“মা,আমি পাখির মতো উড়ে যাব!”

বিকেলে তাঁর তুলসীর পাশে একদল ইটভাটার লোক এল।বাঁশঝাড়ের দিকটাকে ঘিরে বলা হল—“এখানে একটি কিচেন গার্ডেন হবে। পাকা করে,বড় করে।শহরের মতো গার্ডেন।”

শোভাময়ী বললেন,“তবে আমার লাউ,কুমড়ো, চাল কুমড়ো,বেলগাছ,নিমগাছের কি হবে?”

তাঁর কথার কেউ উত্তর দেয় না।

শুধু বাতাসে ঘুরে বেড়ায় কিছু শুকনো পাতার শোঁ শোঁ শব্দ।পাতা ঝরার শব্দ।

ধীরলয়ে তাঁর রান্নার পরিমাণ কমে আসে।

তাঁর সাথে কেউ আর একসাথে খেতে বসে না।

সকালে উঠে দেখেন উঠোনে তাঁকে ছাড়া সকলে বসে আছে।

তিনি এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকেন,

গাছের পাতাগুলোর দিকে তাকিয়ে ভাবেন—

“তোরা কোথাও যাচ্ছিস না তো?”

একদিন নীলা গিয়ে কৌশিককে বলল—

“তোমার মায়ের মাথায় সমস্যা হচ্ছে।কখনো তুলসীর সাথে কথা বলে,কখনো গাছের ডাল ভেঙে কাঁদে!লোকজন হাসে।”

সেদিন রাতে প্রথমবার কৌশিক চেঁচিয়ে ওঠে মাকে লক্ষ করে।

“তুমি কেন গাছেদের সঙ্গে কথা বলো,মা? মানুষ হয়ে পাগলদের মতো আচরণ কেন?”

শোভাময়ীর মুখে তখনও কোনো প্রতিবাদ নেই।

তাঁর হৃদয় শুধু বলে—

“আমি তো আর মানুষদের ভাষা বুঝি না,

গাছেরা যে এখনও আমার কথা বোঝে…”

এরপর এক শুক্রবারের সকালে পুকুরের ঘাটে কাপড় শুকাতে গিয়ে দেখেন,

তাঁর ঘরের দরজা বন্ধ।

তাঁর থালাবাটি,কাঁসার গ্লাস,শাড়ি—সব উঠোনের এক কোণে পড়ে।

ভেতর থেকে আওয়াজ ভেসে আসে,হৃদয়হীনতার কর্কশ শব্দে!

— “মা,আমরা চাই তুমি এখন আলাদা থাকো। কিছুদিন অন্য কোথাও থাকো।এই বাড়িতে অনেক কাজ হচ্ছে,তুমি মানিয়ে নিতে পারছো না।”

শোনার পর ভাষাহীন হয়ে তিনি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকেন।

কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে হাঁটেন পুকুরঘাটের দিকে।একটি শুকনো নিমপাতা হাতে নিয়ে বলেন—

— “হরিপদ,তুমি আমাকে বলেছিলে এই ভিটে আমার জীবন।আজ আমি কোথায় যাবো?”

বিকেল নামে,চাল কুমড়োর লতা মাথা ঝুঁকিয়ে আছে,যেন সে-ও কিছু বলতে চায়।কিন্তু বলতে পারে না।বাগানের গাছেরাও মায়ের আপনার জনের আচরণে নির্বাক হয়ে গেছে।

শুধু একটা শব্দ উচ্চারণ করে মনে মনে-

“মা…!”যা আর কেউ উচ্চারণ করে না।

“আইনের ফাইলে মায়েদের কান্নার ধ্বনি শোনা যায় না,আর সময়মতো না এলে বিচারের চেয়ে মৃত্যু অনেক সহজ হয়ে যায়।”

ছেলে আর পুত্রবধূ মিলে বাড়ির দরজা বন্ধ করার পর,শোভাময়ী প্রথমবার কোনো গাছের ছায়াতেও নিজেকে খুঁজে পেলেন না।

তিনি মাথা নিচু করে পুকুরপাড়ে বসে ছিলেন।

জল শুকিয়ে যাচ্ছে,

যেমন তাঁর চোখের জলও শুকিয়ে গিয়েছে।

একটি কচি কুমড়ো পড়ে আছে মাচার নিচে—কারোর খোঁজ নেই।

এই গাছ,এই শাক,এই বাঁশঝাড়—সবই যেন এখন অন্য কারও।

বাড়ি থেকে তাঁকে বলেই দেওয়া হয়েছে—

“এই বাড়ি তোমার নয়,এই সংসার আমাদের। তুমি বোঝো না?”

পরদিন সকালে তিনি আশ্রয় নেন পাশের গ্ৰামের পাতানো ধর্ম মেয়ের ঘরে—রেণুকা সোম,যে দিনের পর দিন তাঁর হাতের চাল কুমড়োর বড়া খেয়েছে,গায়ে জ্বর জ্বর ভাবে শেফালী পাতার বড়া খেয়েছে,গন্ধভাদালে পাতার বড়ার ঝোল খেয়েছে।আর মনে মনে বলতো—“ভগবান যেন এমন মায়ের হাতের রান্না সবাইকে দেন।”

রেণুকা তাঁকে আশ্রয় দেন,কিছুদিন যাবার পর 

শোভাময়ী বলেন,—“আমি কারও বোঝা হয়ে থাকতে চাই না।আমি বিচার চাই।আমি ফিরতে চাই আমার গাছেদের কাছে।”

শোভাময়ীর বয়স ৬৭ হয়েছে।তা হোক।

কেননা,বুকের মধ্যে তখনও আগুন জ্বলছে। তাঁর গোছানো বাড়িঘর,গাছপালা,পুকুর সব হারানোর আগুন।

রুজি-রুটির জন্য মোটেও নয়,

নিজের মাটির অধিকার ফেরত চেয়ে নিজের ভিতরে আগুন জ্বেলেছিলেন।

এরপর তিনি যোগাযোগ করেন এক সমাজসেবী সংস্থার সঙ্গে।সেখানে একজন স্বেচ্ছাসেবী তাঁকে নিয়ে যান আইন সহায়তা কেন্দ্রে।

তাঁদের সামনে তিনি কাঁপা গলায় বলেন—

—“আমি জমি লিখে দিয়েছিলাম,বিশ্বাসে। এখন তারা আমার খোঁজ নিয়েও দেখে না।বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে।এই যে পাঁচ বিঘে,এটা শুধু জমি নয়,এটা আমার জীবন।”

সহায়তা কেন্দ্র সমস্ত কাগজপত্র খতিয়ে দেখে জানান,আইনত তাঁর পক্ষে মামলা করা সম্ভব।

উকিলবাবুকে তিনি বলেন—“বাবা,আমি মরার আগে একবার আমার গাছগুলোকে দেখতে চাই।আমার পুকুরটাকে একবার ছুঁয়ে যেতে চাই।”

এরপর  মামলা দায়ের হয়,

জমির দখল ও ব্যবহারের ন্যায্যতা নিয়ে।

শুনানির তারিখ পড়ে,

তারপর তারিখ পেছোয়।

তারপর আবার নতুন তারিখ।তারিখ পে তারিখ!এভাবে চলতেই থাকে…

প্রতিবার আদালতে আসেন শোভাময়ী—শাড়ির আঁচলে বেঁধে আনেন পুঁই শাকের একটি কচি ডাল,যা এক প্রতিবেশীর ঘরে জন্মেছে তারই দেওয়া বীজে।

বিচারপতির মুখে সবসময় থাকে ভাষা,

কিন্তু দ্রুত বিচারের সময় থাকে না।

একদিন তাঁকে আদালতের করিডোরে বসে থাকতে দেখা যায়—পরণে সাদা শাড়ি,খালি পায়ে,চোখে জলের রেখা শুকিয়ে গেছে।

তিনি জানেন,রায় আজও হবে না।

তবু আশায় থাকেন।

মনে মনে বিড়বিড় করে বলে যান,

“এই গাছগুলো আমায় ডাকে।আমি ফিরবো। আমাকে ফিরতেই হবে।”

তবে সেদিন দুপুরে তাঁর শরীর খারাপ করছিল।হাত-পা বেশি বেশি কাঁপছিল।

একজন স্বেচ্ছাসেবী এসে বলেছিল—

—“মাসিমা,তুমি একটু ভেতরে গিয়ে বসো। বাইরে গরম অনেক।তাহলে দেখবেন একটু ভালো লাগবে!”

তিনি বলেননি কিছু,সেখান থেকে নড়েন নি।

শুধু চোখ বন্ধ করে তুলসী পাতার নাম নিয়েছিলেন।যে তুলসী পাতার সাথে তাঁর ইষ্ট দেবতার নাম জড়িয়ে আছে।

তারপর… একসময় আদালতের হাজারো ভীড়ের মাঝে নেমে আসে নীরবতা।শোভাময়ী চিরকালের মতো নীরব হয়ে যান!

অনেকক্ষণ ধরে তাঁর কোলের উপর পড়ে ছিল একটি শুকনো পুঁইশাকের ডাল—

আর পাশে পড়ে ছিল একটুকরো দলিলের কপি। মানুষের ব্যস্ততার কোনো এক ফাঁকে মানুষ বুঝতে পারে বৃদ্ধা আর নেই ইহজগতে।

হৃদয় বিকল হয়ে মৃত্যু হয় শোভাময়ী দেবীর।

আদালতের চত্বরে।

দিনের পর দিন বিচারের অপেক্ষায় বসে থেকে থেকে।

তার মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে প্রথমে কেউ কান্না করেনি।করেছিল তাঁর ধর্ম মেয়ে।

কৌশিক খবর পেয়েছিল—বলেছিল,

“আমার সঙ্গে সম্পর্ক নেই।ওই বৃদ্ধা নিজেই বেরিয়ে গিয়েছিল।”

নীলা একটুও চোখের জল ফেলেনি।বরঞ্চ যেন আদালতের চক্কর থেকে বেঁচে হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছিল।

রেনুকায় সেদিন তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করে।তবে সেদিন সন্ধ্যায় এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটে—

বাড়ির পেছনের পুকুরের ধারে হঠাৎ ঝড়ে পড়ে যায় চাল কুমড়োর মাচা।

একটি আমগাছের ডাল ভেঙে যায় বাতাসে।

আর তুলসী থানে আগুন লাগার মতো করে জ্বলতে থাকে একটি ধূপকাঠি—যা কেউ জ্বালায়নি।এই খবর ছড়িয়ে পড়লে 

রেণুকা বলে,

— “মায়ের আত্মা ফিরেছে।গাছেরা বুঝেছে,মা আর নেই।”

শোভাময়ীর দাহ কাজ হয়েছিল স্থানীয় শ্মশানে।তাঁর অন্তেষ্টিতে ছিল না ছেলে,না বউমা।শুধু রেনুকার শিশু বাচ্চা অপু এসে হাতে একটি নিমপাতা দিয়ে বলেছিল—

—”এই পাতাটা তুমি লাগিয়ে দিও,দিদুন।তোমার গাছ তো!”

শোভাময়ীর দেহ ভস্মীভূত হয়ে ছাই মাটিতে মিলিয়ে গেল,কিন্তু রয়ে গেল একটি প্রশ্ন:

এক মা কী শুধু কাগজে লিখে দেওয়া জমির জন্য মূল্যবান,না কি তাঁর ছায়ার জন্যও কিছু মূল্য থাকা উচিত ছিল?

শঙ্কর প্রসাদ সরকার

কমেন্ট

One response to “ঘেরা ছায়া”

  1. শঙ্কর প্রসাদ সরকার Avatar
    শঙ্কর প্রসাদ সরকার

    “খাগ”নামের মধ্যেই এক নতুনত্ব জড়িয়ে আছে। অদ্ভুত একটা নাম।এ শুধু “খাগ”নয়, সৃষ্টিশীলতার নতুন ভূবন।মুক্ত মনার উড়ে চলা খোলা দরজা।প্রথম সংখ্যাতে আমার গল্প জায়গা পাওয়ায় আমি আপ্লুত। অনেক ধন্যবাদ “খাগ” এর সম্পাদক মহাশয়কে।। এগিয়ে চলুক খাগ আপন মহিমায় সাহিত্য সৃষ্টির ভুবনে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *