মাধবীর ক্লাস শেষ হয়ে গেছে সাত পিরিয়ডে। ব্যাগ কাঁধে নিয়ে উঠে দাঁড়ায় – চললাম
মমতা স্মিত হাসে – আজকের মত শেষ হলো ?
– হুম। কাল আবার শিপ্রা সুপর্ণা সঞ্জনা আর সন্ধ্যা নিজেদের মধ্যে গুজগুজ করছিল । একবার ভাবলেসহীন চোখে মাধবীকে দেখে আবার নিজেদের কথায় মেতে ওঠে । চারমাথা এক জায়গায়। ববিতা কানে হেডফোন দিয়ে মোবাইলে সিরিয়ালে মগ্ন। মমতা আবার মোবাইলে অনলাইন শাড়ির সেলে চোখ রেখেছে ।
মাধবী ধীর পায়ে এগিয়ে যায়। স্কুলের কড়িডোর অফিস রুম প্রধান শিক্ষকের ঘর পেরিয়ে স্কুল গ্রাউন্ডে হেঁটে বিশাল গেটের কাছে এসে দাঁড়ায়। সত্যদা দাঁড়িয়ে ছোট গেটের তালা খুলে দিতে মাধবী বেরিয়ে ছাতা খোলে। অগ্রহায়ণের রোদ তবে মিঠে নয় ভীষণ কড়া। ওর কপালে সবই কড়া জোটে। কয়েকজন অভিভাবক ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে বাইরে। মাধবী হাঁটতে থাকে বাজার পেরিয়ে বড় রাস্তা ধরে..
মাধবী ক্লাস শেষ হলে চলে আসে বলে আগে সবাই ঝামেলা করত। প্রধান শিক্ষক নিশিথবাবুও নিষেধ করেছিলেন। মাধবী শোনেনি । অফপিরিয়ডে টিচার্স রুমে বসা যায় না । শুধু কূটকচালি ষড়যন্ত্র আর গ্রুপ বাজি। মনে হয় লেডিস টিচার্স রুমটা যেন ষড়যন্ত্রের আতুর ঘর। এইসব রাজনীতি মাধবীর ভালো লাগেনা। মাঝে মাঝে প্রতিবাদ করে তাই অনেকে শত্রু যায় সহজে। নইলে রান্নাবান্না কাপড়-চোপড় স্বামী সন্তান আর শপিং নিয়েই আলোচনা চলে।
হাঁটতে হাঁটতে পুরনো দিনের অনেক কথাই মনে পড়ে। আগে একটাই টিচার্স রুম ছিল । শিক্ষক শিক্ষিকারা সবাই এক ঘরেই বসতো। বড়রা ছোটদের খুব স্নেহ করত। কত গল্প হতো। শেক্সপিয়ার দান্তে মার্কস গান্ধী রুশো ডারউইন রবীন্দ্রনাথ কালিদাস বিবেকানন্দকে নিয়ে আলোচনা হতো। আরো কত কত বিচিত্র বিষয় আলোচনায় উঠে আসত। আলোচনা হতো অর্থনীতি সমাজনীতি রাজনীতি নিয়ে। দুই ভিন্ন পার্টির নেতা শিক্ষকতা করত। ঝগড়া ছিল না পার্টি বাজি ছিল না তবে কৌতুক মজা করে এ ওকে বলত আর আসর জমে উঠতো। এখন দুটো টিচার্স রুম। প্রথমটা শিক্ষিকাদের জন্য। শিক্ষকদের জন্য আলাদা রুম। সেখানেও সব শিক্ষকরা বসেনা । অনেকেই অফিস রুম লাইব্রেরী রিডিং রুমে আলাদা আলাদা জায়গায় বসে। সবার সঙ্গে বিবাদ। এটা শুধু মতান্তর নয় বরং মনান্তরই বললে ভালো। মাধবীরও ভালো লাগে না মেয়েদের রুমের এইসব আলোচনা। শাড়ি গয়না স্বামী সন্তানের বাইরে এদের যেন কোনও যোগাযোগ নেই। নতুন নতুন শিক্ষক শিক্ষিকারা জয়েন করেছে। পুরোনো আর কেউই নেই । মাধবীরও যাবার সময় হয়ে এলো। প্রায় শেষের ঘণ্টা বাজার সময় হয়ে গেছে।
বড় রাস্তা পেরিয়ে গলি ধরে মাধবী। এই সময় খুব একটা পথচারী রাস্তায় থাকে না। দু একজন অভিভাবক সাইকেল বা বাইকে করে সন্তানকে স্কুল থেকে নিয়ে বাড়ি ফেরে । মনে পড়ল ছেলে শুভ নার্সারিতে পড়তো তখন স্কুলের গাড়ি ছিল, তারাই নিয়ে যেত দিয়ে যেত। কিন্তু ও পঞ্চম শ্রেণীতে ওঠার পর নিজের স্কুলেই ছেলেকে ভর্তি করে দিয়েছিল। বয়সে একটু কম ছিল। প্রথম কয়েকদিন সাথে নিয়ে যেতে স্কুলের প্রধানশিক্ষক দেখে বললেন –
সাথে সাথে ছেলেকে নিয়ে যাচ্ছো কেন? ও তো বড় হয়েছে, একা একাই যেতে পারবে। সন্তানকে ছাড়তে হবে বেঁধে রাখলে চলবে না ।
এরপর থেকে শুভ কিছুতেই মায়ের সাথে যায় না। একা একাই স্কুলে চলে যায় জোর করে। যদিও স্কুল খুব একটা দূরে নয়। মিনিট দশ লাগে বলে মাধবীরও বেশি চিন্তা হয় না। আবার স্কুল ছুটিও আগে হয়। কাজেই বাড়িতে ও একা একাই ফিরে যেত।
এখন শুভ মাস্টার্স কমপ্লিট করে প্রাইভেটে একটা চাকরি করছে। ওকে নিয়ে খুব একটা চিন্তা করতে হয়না। সৎ মানসিকতা সরলতা ওকে ঘিরে আছে। তবে খুবই জেদি, নিজেকে মূল্যায়ন করতে জানে। জীবনে চলার পথে যে উদ্যম দরকার তা ওর আছে। আর সবটাই বিধাতার ইচ্ছা। এসব ভাবতে ভাবতে বাড়ি চলে আসে। গেট খুলে ভেতরে যায়। খুব ক্লান্ত লাগে নিজের। তবু মনে হয় এখনও অনেক কাজ বাকি। কাজেই নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।
দোতালায় ঘরের কাজ চলছে। একটা বেডরুম ব্যালকনি ট্র্যাকচার প্রায় কমপ্লিট । এখন মেঝেতে টাইলস আর রং হয়ে গেলে ঘর সাজানো লাগবে। ছেলের বিয়ে দিতে হবে। মাধবী অনেক বয়স করে বিয়ে করেছে। বরেরও অনেক বয়স হয়েছিল। মাত্র বারো বছরের দাম্পত্য জীবন। তার মধ্যে বছর চার পাঁচ অসুস্থ ছিল স্বামী ।একা একা ছেলেকে মানুষ করতে খুবই কষ্ট হয়েছে। ঘরে বাইরে কাজ, তা ছাড়া ছেলে প্রায় সময় একাই একাই বাড়িতে বড় হয়েছে। এইসব সাত পাঁচ ভেবেই ছেলের আগেই বিয়ে দিতে চায় মাধবী।
শীতের বিকেল পড়ন্ত রোদ গায়ে মেখে অনেকেই বাড়ির সামনে চেয়ার পেতে উল বোনে। মাধবী অবশ্য বাগানের পরিচর্যা করে। বিকেলের আলোর আবির মুখে ছড়িয়ে পড়তে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। খুব দ্রুত সন্ধ্যা নেমে আসে। অন্ধকার নামতে কুয়াশায় ভরে যায় চারদিক। মাধবীর মনের মধ্যেও কুয়াশা। চিন্তা অনেক আচ্ছন্ন করে রেখেছে, অনেক হিজিবিজি কথা মনের মধ্যে অবিরাম কাটাকুটি খেলছে। রাজনৈতিক সামাজিক টানাপোড়েন এই অপরাহ্ন জুড়ে মাধবীকে গ্রাস করেছে। মনের মধ্যে প্রভুত্ব করছে সংশয়। বড্ড একা লাগে। একটা বন্ধু বা একটা প্রিয়জনের বড় অভাব। মনের কথা বলে হালকা হওয়ার নেই কিংবা পরামর্শ দেবার কেউ নেই। দোদুল্যমান মন শুধু একটা নির্ভরতার জন্য উদগ্রীব হয়। স্কুল কলেজ জীবনের বান্ধবীরা কে কোথায়? কোনও যোগাযোগ নেই। কর্মস্থলে গ্রুপিং চলে তাই বন্ধুত্ব জায়গা করে না। পাশে থাকার কোনও নির্ভরযোগ্য হাত নেই। মনে হয় এই অপরাহ্নে যেন তার খুব প্রয়োজন।
এখন সেইভাবে ক্লাস হচ্ছে না। পরীক্ষা হয়ে গেছে। খাতা দেখা চলছে। দলবাজি প্রকাশ্যে ।একাডেমি হল লাইব্রেরীতে জোড়ায় জোড়ায় আড্ডা আর গুজগুজ। সেখানেই কাঠিবাজির চক্রান্তগুলি ঝালিয়ে নেয়। সেখানে খেলা চলে । মাধবীর মনে হয় শিক্ষকরা যেন এই সমাজের সবচেয়ে নিকৃষ্ট জীব। এত নোংরামো। কোন শালিনতা নেই সৌজন্যতা নেই সমালোচনার ভয় নেই। অন্যায়কারীরা প্রভাবশালী । যদিও সংখ্যায় কম । তবে ভালো মানুষও আছে, কিন্তু তারা নিষ্ক্রিয় উদাসীন। আর নিজের সমস্যা না বাড়াতে চুপ করেই থাকে। তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা আছে বলেও মনে হয় না।
অফিস থেকে ছেলে ফিরেই মাকে চিন্তিত দেখলেই জিজ্ঞেস করবে-
– কি হয়েছে মা? তোমার কোনও অসুবিধা হয়েছে? – না না কিচ্ছু হয়নি।
– তবে বই পড়ছো না, লেখালেখি করছো না তাই ভাবলাম।
-নারে কিছু হয়নি।
আসলে ছেলেকে কিছু বলা যায় না। প্রচন্ড রাগী তারপর ও এই স্কুলেরই ছাত্র। শিক্ষক-শিক্ষিকা অসভ্যতা করছে, নোংরামি করছে, মা হয়ে ওকে বলে কি করে? শুধু নিজেই ক্ষত বিক্ষত হয়। স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি ডানপন্থী। বর্তমানে সরকার পক্ষের। কিন্তু এখানে বামপন্থীদের প্রভাব বেশি। সবাই একজোট। দূর থেকে সবাই আসে একসাথেই একাডেমী আর টিআর-এর পদ দখল করে আছে। আর যারা এলাকায় থাকে তারা এ ওর সাথে বিবাদে জড়িয়ে পড়ে, নইলে ইগোর সমস্যা। হয়তো ওরা গোপনে কলকাঠি নাড়ছে। প্রধানশিক্ষক এই হচপচ কাটিয়ে ওঠার মতো অবস্থায় নেই। সবাই তো দল ভারির দিকে ঝুঁকে পড়ে। ন্যায় অন্যায় দেখেনা। আর প্রতিদিন গন্ডগোল সামলানোও যায় না, তাই যেমন চলছে তেমনি চলছে। কাজেই স্কুলের পরিবেশ ক্রমশ দূষিত হচ্ছে। আর প্রতিক্ষণে পালা করে একেক জনকে জব্দ করে ওরা।
মাধবী কোনওদিনই কাউকে আঘাত করে না। শুধু নিজেদের প্রোটেক্ট করে। পাল্টা আঘাত না পেয়ে ওরা আরও ভয়ঙ্কর পলিটিক্স করে। আর যাদের জন্য মাধুরী লড়াই করে, দুদিন পরে দেখা যায় ওরা ভয় পেয়ে ওদের সাথে সমঝোতা করে নেয়।
-কি করব! এত ঝামেলা করে থাকা যায়? রোজ রোজ ওরা তো পিছনে লেগেই আছে। কে আমার হয়ে কথা বলবে? তার চেয়ে অ্যাডজাস্ট করে চলাই ভালো।
– তাই বলে শিরদাঁড়া সোজা থাকবে না!
– শিরদাঁড়া সোজা রাখলে ওরা ভেঙ্গে ফেলবে। তার চেয়ে নিজেই বাঁকিয়ে নেই। কেউ ভাঙ্গতে পারবেনা।
মাধবীর কিছুই করার থাকে না। স্কুলের শিক্ষকদের মধ্যে যে এত রাজনীতি চলতে পারে, লেখাপড়া না জানা মানুষেরা তা ভাবতেই পারবে না।
বিদায়ের দিন চলে আসে। প্রিয় ছাত্রছাত্রীরা কান্নায় ভেঙে পড়ে। স্কুলের শিক্ষকদের মধ্যে খুব উৎসাহ। তারা আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। খুব সুন্দর করে স্কুলকে সাজিয়েছে। কত লোককে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। সবাই কত প্রশংসা করে বক্তব্য রাখছে। ভালোবাসায় সিক্ত মাধবীর চোখের সামনে একে একে ভেসে উঠছে দীর্ঘ পঁচিশ বছরের শিক্ষকতার যাপন ছবি। সব আনন্দ বেদনা মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে।
তবে মাধবীর মনখারাপ করার সময় নেই। ছোটাছুটি করতে হচ্ছে। আগামীকাল ছেলের বিয়ে। বাড়িতে আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবের ভীড়। রঙিন প্যান্ডেল আলোর রোশনাই সানাই। ছেলের বৌকে বরণ করে ঘরে তুলতে হবে।
আনন্দে কেটে যায় কয়েকটি দিন। হাসি মজা হুল্লোড়ে অনুষ্ঠান শেষ। অতিথিরা যে যার বাড়ি ফিরে গেছে। ছেলে বৌ মধুচন্দ্রিমা কাটাতে পাহাড়ে ।
মাধবী অনেক দিন পর আবার খাতা কলম তুলে নেয়। নতুন গল্পে হাত দিয়েছে। পুজোতে এবার কয়েকটি গল্প আর দুটি উপন্যাসের অর্ডার আছে।
লেখক – অর্চনা দে বিশ্বাস
অঙ্কন – পার্থ মিত্র


Leave a Reply